• মেডিটেশন কী এবং এটা কিভাবে কাজ করে?

    মেডিটেশন হলো একটা মানসিক/আধ্যাত্মিক টেকনিক যার মাধ্যমে আমরা অশান্তি ও অস্থির মনকে রিল্যাক্স করতে পারি। এছাড়া এই টেকনিক ব্যবহার করে আমাদের মনকে যাবতীয় উদ্বেগ উৎকন্ঠা ও স্ট্রেস হতে মুক্ত করতে পারি। অনুশীলনের মাধ্যমে আপনি যখন মেডিটেশনের উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছে যাবেন তখন এর উদ্দেশ্য হবে আধ্যাত্মিাকে জাগ্রত করে মনের প্রশান্তিকে আকর্ষন করা এবং মনের গভীরের নিরবতা অর্জন করা।
    মেডিটেশন হলো কোনো একটা নির্দিষ্ট চিন্তা ধারনা, সৃষ্টিকর্তার অভিমুখে অথবা কারো সচেতনতার উপর মনোযোগ স্থাপন করা এবং এটা সাধারনত চিন্তা চেতনাকে বাহিরের জগৎ থেকে সরিয়ে টেনে ভেতরে আনে। মেডিটেশনের সময় মন প্রায়ই এদিক সেদিক চলে যায় বা বিক্ষিপ্ত চিন্তা ভাবনা ভর করে অথবা অজানা অচেনা বিষয়বস্তুর সংস্পর্শে এসে অবাক হয়ে পড়ে। তাই মেডিটেশন চর্চাকারীকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে সতর্ক থাকতে হয় এবং বার বার মনকে মেডিটেশনের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে হয়। অবশ্য অনুশীলননের শুরুতে একটু বেশি করে চর্চার চেষ্টা করতে হয় এবং বার বার অনুশীলন করে এটাকে আয়ত্ত করতে হয়। দক্ষতা অর্জনের সাথে সাথে অনুশীলনের ব্যাপ্তিকাল কমে যায়। আপনি যখন মনকে একবার শান্ত রাখার প্রক্রিয়া আয়ত্ত করা শিখে যাবেন তখন মনকে বিক্ষিপ্ত চিন্তা ভাবনা থেকে দূরে একটা অভ্যাসে পরিনত হয়ে যাবে আপনার।
    উচ্চ স্তরের মেডিটেশনে অবচেতন মনকে বাধ্যতামূলক ভাবে অবিরাম চিন্তা করার অভ্যাস থেকে দূরে রাখা যায়। এটা আমাদেরকে মনের প্রশান্তি, স্বকীয়তা অর্জন করার পথ দেখায়। সত্ত্বার মৌলিক গাঠনিক সচেতনতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। আমার ভেতরের আমি সম্পর্কে কিছুটা ধারনা লাভ করা যায়। আত্মা- যেটা মনকে ছাড়িয়ে অন্য কিছু। এটা আমাদেরকে প্রশান্তি সত্য এবং পরম সুখের দিকে ধাবিত করে।
    প্রাচ্য এবং প্রাশ্চাত্যে বিভিন্ন ভাবে মেডিটেশন চর্চা করা হয়। তবে এটা চর্চা করার জন্য আপনাকে মুনী, ঋষি, নির্জনবাসী, নিভৃত্যচারী, তীর্থস্থান, আথবা কোনো আশ্রমে যাবার প্রয়োজন নাই। সত্যিকার অর্থে দৈনন্দিন কাজ কর্ম চালিয়ে এবং স্ত্রী সন্তানের সাথে থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করেও আপনি মেডিনেশন চর্চা করতে পারেন। এর জন্য আপনাকে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের অনুসারী বা মতালম্বিও হতে হবে না। বিশেষ কোনো পোষাক অথবা কোনো নির্দিষ্ট জীবন ধারারও প্রয়োজন নাই। মেডিটেশন হলো অন্ত:চর্চামুলক জ্ঞান, যেটা যে কোনো জায়গায়, যে কোনো সময় চর্চা করা যায়। আপনার বাহ্যিক ক্রিয়া কর্মে এটা কখনই আপনার উপর প্রভাব ফেলবে না। বিশ্বে অনেক ধরনের মেডিটেশন টেকনিক ও ঐতিহ্য আছে, কোনোটা এফারমেশন এর উপর নির্ভরশীল আবার কোনোটা ভিজুয়ালাইজেশনের এর সাথে জরিত। কোনো কোনো টেকনিকে নির্বাচিত এফারমেশন এর অর্থের উপর গভীর মনোযোগ স্থাপনের প্রয়োজন পড়ে। অন্যান্য গুলোতে শ্বাস প্রশ্বাসের উপর মনোযোগ স্থাপনের প্রয়োজন পড়ে, আবার কোনোটিতে মোমবাতি অথবা বিশেষ আকৃতির দিকে মনোনিবেশ করতে হয়। এছাড়া অনেক টেকনিক আছে যে গুলোতে মনের সুনসান নিরবতা এবং অন্তর্নিহিত সত্ত্বার প্রতি গভীর মনোযোগের প্রয়োজন পড়ে। অনেক ধরনের টেকনিক থাকা সত্ত্বেও মেডিটেশনকে প্রধানত: দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো কোনো চিন্তা ধারনা বা আদর্শের উপর চিন্তাকে ফোকাস করা হয় আর অন্যটিতে আরও একটু এগিয়ে সকল চিন্তা দূর করে মনকে শুণ্য করে মনের গভীরতর নীরব নিস্তব্ধ জগতে প্রবেশ করতে হয়। এটা কোন নিষ্প্রভ বা অবচেতন অবস্থা নয়, এটা হলো প্রকৃত সত্ত্বার সচেতনতা, গভীর প্রশান্তির মনোজগৎ। সাধারণ ভাবে একটি ডাইনামিক অপরটি হলো প্যাসিভ।
    মেডিটেশন মনের এই অবস্থান নয়, যেখানে আপনি অলস হয়ে পড়বেন কিংবা অবাস্তব বা স্বপ্নের জগতে বিচরণ করবেন। এটার অনুশীলন এবং সফলতা অর্জনের জন্য আপনাকে সামান্য মনোযোগ করার ক্ষমতা সম্পন্ন হতে হবে। থাকতে হবে আত্ম-শৃঙ্খলা বোধ, প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি এবং অধ্যাবসায়ী মনোভাব মনে করবেন আপনি কোন বিষয়ে ক্ষমতা অর্জন করতে চান। তাহলে প্রথমেই আপনাকে সে বিষয়ের আদ্যপান্ত জানতে হবে। পরিস্কার ভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা থাকতে হবে, থাকতে হবে প্রয়োজনীয় সময়। প্রচেষ্টা ও অফুরন্ত প্রান শক্তি, তাহলেই আপনি বিষয়টির উপর দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন। হয়ে উঠবেন সে বিষয়ে পন্ডিত।
    নিয়মিত মেডিটেশন চর্চায় আপনার আচার আচরন, চিন্তা ভাবনা, স্বভাব চরিত্র মনের অবস্থান এবং দৃষ্টিভংগির উপর প্রভাব বিস্তার করে। নিয়মিত চর্চার ফলে ধৈর্য, সহ্য, সনের প্রশান্তি, আন্তবিশ্বাস, শৃঙ্খলাবোধ, আন্তশক্তির প্রভুত উন্নতি করে। স্বাস্থ্যের উপর এর উপকারী প্রভাসগুলো এখানে উল্লেখ করা হয়নি। বলা হবে এর মাধ্যমে স্বাসযগত উপকার পেতে হলে আপনাকে নিয়মিত মেডিটেশন অনুশীলন করতে হবে। ঠিক যেমনটি প্রত্যেকদিন আহার করেন, চাকরী করেন, পরিশেষে রাতে ঘুমাতে যান। ঠিক সে ধরনের নিয়ম মেনে অঅপনি চর্চা করবেন।
    মেডিটেশনের উপকারীতা
    নিয়মিত মেডিটেশন অনুশীলন আপনার অশান্ত, অস্থির ও বিক্ষিপ্ত মনেকে স্থির ও শান্ত করে। বিক্ষিপ্ত ও ক্ষতিকারক ক্ষতিকারক চিন্তা ভাবনাকে হ্রাস করে। মনকে রিলাক্স করে একটা শীতল প্রশান্তির সৃষ্টি করে। এর ফলে যেহেতু মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি পায় তাই মনের প্রতি মনোযোগী হওয়ার এবং ফোকাস করার দক্ষতারও প্রভূত উন্নতি ঘটে।
    মন শান্ত থাকলে ভুল কম হয়, বিচার বিশ্লেষন ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। সর্বোপরি প্রচন্ড ধৈর্যষীল এবং সহিঞ্চু হওয়ার দক্ষতা অর্জন করা যায়। ফলশ্রুতিতে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক বন্ধুত্ব, প্রতিবেশী এবং সহকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। মেডিটেশনের সুফল এখানেই শেষ নয়। নিয়মিত মেডিটেশন মানুষের সুখ শান্তি বৃদ্ধি করে ও নৈতিক অবক্ষয় রোধ করে। যেহেতু মন অধিক থেকে অধিকতর প্রশান্তিতে ভরপুর থাকে, তাই দুশ্চিন্তা উৎকন্ঠা, ভয় এবং নেতিবাচক চিন্তা দূর হয়ে যায়। এই উপসর্গ সমুহের অনুপস্থিতিতে আমাদের মনের গহীনে লুকায়িত সুখশান্তি বাধাঁহীনভাবে বেড়িয়ে আসতে থাকে।
    স্বাভাবিকভাবে আমরা যে সকল মানসিক চাপ এবং টেনশনের মুখোমুখি হই তার বেশীর ভাগই আমাদের মনের অতীত অভিজ্ঞতার ফল। শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতাসহ বেশীর ভাগ সমস্যার সূচনা হয় ও বিস্তার লাভ করে আমাদের এই অযাচীত মানসিক চাপ এবং টেনশন থেকেই নিয়মিত মেডিটেশনের মাধ্যমে এই অযাচিত মানসিক চাপ এবং টেনশন কমানো যায়। আমাদের মন যখন প্রশান্তিতে থাকে তখন বেশীর ভাগ সমস্যা আপনা আপনিতেই সমাধান হয়ে যায়, দূর হয়ে যায় এবং অন্যান্য সমস্যাকে আমরা সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে শিখে যাই।
    আমাদের মন যখন বিশৃঙ্খল অবস্থায় থাকে তখন সে যে কোন ধরনের চিন্তা ভাবনাকে গ্রহণ করে । এর ফলে মহামূল্যবান সময় ও এ্যনার্জিকে অপ্রয়োজনীয়, নিষ্ফল নেগেটিভ চিন্তা ধারনার পিছনে ধাবিত হতে প্ররোচিত করে। এই বিশৃঙ্খল মন প্রায়ই সমস্যাটিকে আরো জটিল করে তুলে এবং সমস্যা সমাধানের বাইরে নিয়ে যায়। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত এবং প্রশিক্ষন প্রাপ্ত মন এই বিক্ষিপ্ত চিন্তা চেতনাকে প্রশমিত করে, ফলে এই গুলির অবস্থান ও অস্তিত্ব আমাদের জীবনে থাকে না। সময়ের বিবর্তনে আপনি দেখতে পাবেন, আপনার আচার আচরন, দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তা করার পদ্ধিতির পরিবর্তন হয়ে গেছে। আপনি হয়ে উঠবেন আরো পজেটিভ। আরো সৃষ্টিশীল, লোকজনের সাথে ব্যবহারে হবেন ধৈর্যশীল ও শান্ত স্বাভাবের। আপনি আপনার দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন চরাই উৎরাইকে সফলভাবে মোকাবেলা করতে পারবেন। আরো পারবেন জীবনের অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে বা বিভিন্ন কার্য সম্পাদনে লোকজনের সাথে সাফল্যজনকভাবে মোকাবেলা করতে পারবেন। তখন আপনার নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ আরো পজেটিভ, কার্যকারী ও তৃপ্তিদায়কভাবে ব্যবহার করতে পারবেন।
    মেডিটেশনের উপকারীতাকে শারিরীক, আবেগপ্রবণ, মানসিক, আধ্যাত্মিক শ্রেণীতে ভাগ করা যয়। কিছু খুব দ্রুতলয়ে সংঘটিত হয় এবং অন্যান্য গুলো ঘটতে একটু বেশি সময় নেয়। এটা নির্ভর করে আপনার অনুশীলনে কতটুকু যত্নবান, আকাঙ্খার মাত্রা, প্রাথমিক ভাবে কেমন ও কতটুকু মনোযোগ দিতে পারেন তা নির্ভর করে আপনার অন্ত-দক্ষতার উপর। প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে একদিন অথবা কয়েকদিনে একবার মেডিটেশন অনুশীলন করা যথেষ্ট নয়। আপনাকে সফলতা অর্জন করতে হলে. নিয়মিত প্রতিদিন একনিষ্ঠভাবে এটাকে চর্চা করতে হবে। তবেই সফলতা আপনার কাছে ধরা দিবে।
    এখানে নিয়মিত মেডিটেশনের অনুশীলন যারা করেন তারা যে শারীরিক শারীরিক উপকার গুলি পান , তা হলোঃ গভীর স্তরের রিল্যাক্সজেশন, খাদ্যের বিপাকীয় গতি এবং হার্টের বিট কমিয়ে গভীর প্রশান্তি দিতে সাহায্য করে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে, ফুসফুসে বায়ুপ্রবাহের উন্নতি করে। এ্যানার্জি লেভেল বৃদ্ধি করে, পেশীর সংকোচন প্রসারনকে নিয়ন্ত্রিত করে, চাপ মুক্ত করে।
    - খুব সহজেই সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করে এবং গভীর ঘুমের আবহ সৃষ্টি করে।
    - শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাতে মজবুত করে তোলে।
    এবার আমরা দেখাবো মানসিক এবং আবেগজনিত উপকারিতায় কীভাবে সাহায্য করেঃ
    - বিক্ষিপ্ত চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
    - যেকোনো পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে শান্ত থাকার সামর্থ্যে দক্ষতর করে।
    - অধিকতর সৃষ্টিশীল করে তোলে।
    - উৎকন্ঠা দূর করে।
    - দুশ্চিন্তার প্রবনতা হ্রাস করে।
    - ডিপ্রেশন নিয়ন্ত্রনে সাহায্য করে।
    - স্নায়বিক দুর্বলতা সহজে যাওয়ার প্রবনতা এবং অস্থিরচিন্তা হ্রাস করে।
    - আত্ম-বিকাশের উন্নতি করে।
    - মনোযোগ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
    - আত্মশৃঙ্খলাবোধ বৃদ্ধি করে।
    - পড়ালেখার দক্ষতা এবং স্মৃতিশক্তির উন্নতি করে।
    - জীবনীশক্তির অনুভূতি বৃদ্ধি করে।
    - আবেগের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করে।
    - অন্তঃজ্ঞানের বিকাশে উন্নতি ঘটায়।
    মেডিটেশনের আধ্যাত্মিক উপকার
    - মনের প্রশান্তি।
    - আবেগ এবং মনের পৃথকীরণ।
    - আমার আমিত্ব সম্পর্কে ধারণা লাভ।
    - শরীর ও মনকে ভেতর ও বাহির থেকে দেখার ক্ষমতা অর্জন।
    - আত্ম অহামিকাকে নিয়ন্ত্রনে রেখে নিজের সচেনতাকে আবিষ্কার।
    - সত্যিকারের সত্তাকে খুঁজে বের করা।
    - আধ্যাত্মিকতাকে জাগরিত করা এবং আত্ম-অনুধাবনবোধ অর্জন করা।
    এছাড়াও আরো অনেক উপকার পাওয়া যায়। তবে যেহেতু মেডিটেশনকে অনেকে হিপনোটিজমের সাথে মিলিয়ে ফেলেন, তাই আপনি যদি মেডিটেশন শিখতে চান তাহলে আগে ভাগেই যেনো সেটা যেনে হিপনোটিজম না হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠান মেডিটেশনর নামে হিপনোটিজম এর চার্চয় লিপ্ত। তাই কারো দ্বারা হিপনোটাইজ হয়ে আপনি প্রতারিত হন বা প্রভাবিত হয়ে আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করেন তা আমরা চাই না। সৃষ্টিকর্তা আপনাকে দেহ ও মন নামক যে মহামূল্যবান সম্পদ দিয়েছেন সেই ভান্ডারের চাবি আপনি অন্য কারো কাছে নির্দ্বিধায় দিয়ে দেবেন না। আপনি আপনার নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছেই রাখুন। আপনার জন্য বা সকল মানুষের জন্য, অন্য কথায় সমগ্র সৃষ্টির জন্য যা মঙ্গলজনক, সেই সঠিক সিদ্ধান্তটি আপনি গ্রহণ করুন।
    তাই আর্ন্তজাতিক ভাবে স্বীকৃত ও প্রশিক্ষিত প্রশিক্ষকের কাছেই মেডিটেশন শেখা উচিত।