• শিশুর সোশ্যাল অ্যাংজাইটির সমস্যা ও এর প্রতিকার

    সাধারণত ৫-৬ বছরের শিশু ও উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরীরাই সোশ্যাল অ্যাংজাইটির সমস্যায় বেশি ভুগে থাকে। যে সব শিশুরা সামাজিক পরিবেশে যেতে ভয় পায় তাদের অন্য কারো সাথে কথা বলার হার কমতে থাকে আস্তে আস্তে। তাঁরা কোন জায়গায় আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দুতে থাকতে পছন্দ করেনা। সামাজিক কোন পরিবেশে অন্য কারো সাথে কথা বলার জন্য জোর করলে তাঁরা উদ্বিগ্ন হয়।
    একটা নির্দিষ্ট বয়সের আগে শিশুর সোশ্যাল অ্যাংজাইটি অলক্ষিত থেকে যায়। কারণ এই সমস্ত শিশুরা বেশিরভাগ সময় বই পড়ে কিংবা একা একা যে কাজ গুলো করা যায় সেগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সন্তান বেশিরভাগ সময় একা একা পড়াশোনা করলে বাবা-মায়েরাও কিছু মনে করেননা। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পর যখন নতুন কোন সামাজিক পরিবেশে নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার সময় তাঁদের সামাজিক উদ্বিগ্নতার লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং তখনই পিতামাতারা বুঝতে পারেন যে তাদের সন্তান সোশ্যাল অ্যাংজাইটি সমস্যায় ভুগছে।
    সোশ্যাল অ্যাংজাইটিকে সোশ্যাল ফোবিয়া বা সামাজিক বিতৃষ্ণা ও বলে। সোশ্যাল অ্যাংজাইটিতে যারা ভোগেন তাদের মধ্যে কিছু শারীরিক লক্ষণ প্রকাশ পায় যেমন- পেট ব্যাথা, বমি বমি ভাব, মুখ রক্তিম হয়ে যাওয়া এবং শরীর কাঁপার সমস্যা হয়। সোশ্যাল অ্যাংজাইটিতে আক্রান্তরা আরো যে সমস্যা গুলোতে ভোগেন তা হলো
    • তাঁরা লাজুক ও পশ্চাদগামী হয়
    • অন্য শিশুদের সাথে মিশতে বা কোন গ্রুপে জয়েন করতে সমস্যা হয়
    • খুব কম বন্ধু থাকে
    • অন্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর মত সামাজিক পরিস্থিতিকে এড়িয়ে চলে এরা। যেমন- টেলিফোনে কারো সঙ্গে কথা বলা, ক্লাসে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা ও উত্তর দেয়া ইত্যাদি।
    সোশ্যাল অ্যাংজাইটি সনাক্ত করা খুব সহজ নয়। কারণ যাদের সোশ্যাল অ্যাংজাইটি আছে তাঁরা প্রি-স্কুল এবং স্কুলে শান্ত ও অনুগত থাকে। তাঁরা তাদের ভয় ও উদ্বেগ নিয়ে কথা বলেনা।
    প্রতিকারের উপায়
    পরিবারের সদস্য, স্কুলের শিক্ষক, থেরাপিস্ট ও শিশু বিশেষজ্ঞ এর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সোশ্যাল ফোবিয়ার চিকিৎসা করা যায়। এই চিকিৎসায় মানসিক হস্তক্ষেপ-কাউন্সেলিং, জৈবিক হস্তক্ষেপ-ঔষধ এবং বাসা ও স্কুলের পরিবেশ শিশুর স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। এক্ষেত্রে শিশুর পরিবার, স্কুল এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সম্মিলিত প্রয়াস ও জীবন যাপনের মানের পরিবর্তনের ফলে শিশুকে সোশ্যাল ফোবিয়ার সমস্যা থেকে মুক্ত করতে পারে। যদি আপনার শিশুর সোশ্যাল অ্যাংজাইটির সমসাটি থাকে তাহলে তাঁর আপনার সাহায্যের প্রয়োজন। তাঁকে সাহায্যের জন্য আপনি যা যা করতে পারেন তা হল –
    ১। আপনার সন্তান যে বিষয়ে ভয় পায় বা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয় সেই বিষয়ে তাঁকে প্রস্তুত করে তুলুন। এজন্য বাড়িতে সেই বিষয় গুলোর অবতারণা করে তাঁকে সেই বিষয়ে সহজ হতে শেখান।
    ২। বাহিরের কোন মানুষের সামনে কথা বলা বা কিছু করার জন্য আপনার সন্তানকে চাপ দেবেন না।
    ৩। যখন আপনার সন্তান উদ্বিগ্নতা দূর করে কোন কাজ করতে সমর্থ হয়, যেমন- ফোনে কথা বলা, তখন তাঁর অর্জনের জন্য প্রশংসা করুন এবং উৎসাহ দিন। সে যে চেষ্টা করছে এজন্য আপনি গর্বিত অনুভব করছেন এটা তাকে বলুন এবং তার সামর্থ্য সম্পর্কে তাঁকে বিস্তারিত ভাবে বোঝান।
    ৪। যখন আপনার শিশু কোন ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দেখায় চিন্তিত হবেন না। এজন্য তাঁকে কোন শাস্তি বা বকাবকি করা থেকে বিরত থাকুন।
    ৫। প্রি-স্কুল, কিন্ডারগার্টেন বা স্কুলে আপনার সন্তানের অ্যাংজাইটির বিষয়টি জানিয়ে রাখুন এবং আপনি এর সমাধানের জন্য কি করছেন সেই সম্পর্কে তাঁদের জানান ফলে বাচ্চার আশেপাশের সবাই তাঁকে সাহায্য করতে পারবে।
    ৬। নতুন কিছু করার জন্য এবং সামাজিক প্রোগ্রামে অংশ গ্রহণের জন্য তাঁকে উৎসাহ দিন।
    ৭। আপনি যতই হতাশ হন না কেন! সামাজিক পরিস্থিতিতে সে যদি সফল না হয় তাহলে তাঁর সমালোচনা করবেন না।
    ৮। সামাজিক এমন কোন পরিস্থিতিতে আপনিও এইরকম উদ্বিগ্নতা অনুভব করতেন, এটা তাঁকে বলুন। এই কথাটি বললে সে বুঝতে পারবে যে, আপনি তাঁর সমস্যাটি বুঝতে পারছেন এবং তাঁকে সাহায্য করছেন।
    ৯। লজ্জাবোধ, উত্তেজিত হওয়া ও আত্মমর্যাদা বোধ নিয়ে কোন গল্প গল্পের বই পড়ে বা কোন গল্প তৈরি করে তাকে বলুন। এতে সে বুঝতে পারবে সে একমাত্র ব্যক্তি না যে এই সমস্যায় ভুগছে।
    ১০। সন্তানের প্রতি আপনার ইতিবাচক মনোভাব তাঁর আত্মসম্মান বোধ বৃদ্ধি করবে এবং এই সমস্যা থেকে বেড়িয়ে আসতে সহযোগিতা করবে।
    কোন মানুষের মধ্যে লাজুক ভাব থাকা কোন সমস্যা না। অনেক লাজুক ছেলেমেয়ে আছে যারা সন্তোষজনক ভাবেই বেড়ে উঠে, তাদের দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্ব ও হয় এবং তাঁরা সুখী ও পরিপূর্ণ জীবনযাপন করে। হতে পারে লাজুক ভাব ও সামাজিক বিতৃষ্ণা আপনার সন্তানকে প্রতিদিনের কাজ যেমন- শ্রেণী কক্ষের আলোচনা, আনন্দদায়ক কোন ঘটনা যেমন- পার্টি অথবা বন্ধুত্ব স্থায়ী করতে না পারার মত সমস্যা গুলোতে ভোগাচ্ছে। খেয়াল করুন আপনার সন্তানকে এবং সাহায্য করুন এই সমস্যা থেকে বেড়িয়ে এসে জীবনকে পরিপূর্ণ ভাবে উপভোগ করতে।