• অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা নিতে শিক্ষার্থীদের করনীয়

    অস্ট্রেলিয়ায় পড়ার জন্য কী কী করতে হবে? এখানে আন্ডারগ্র্যাড করার জন্য প্রচুর পরিমাণ টাকা লাগে। বছরে প্রায় ৪০-৫০ লাখের মতো। কাজেই, দেশের বেশিরভাগ মানুষের জন্য সেই অপশন বাদ। পোস্টগ্র্যাড আবার দুই রকম, একটা Postgrad/Masters by coursework, আরেকটা Postgrad/Masters/Higher degree by research। রিসার্চের ক্ষেত্রে ডিগ্রিটা পিএইচডিও হতে পারে, কাজেই Higher Degree শব্দটাও অনেক সময় জুড়ে দেয়া হয়। Coursework এর উপর ভিত্তি করে মাস্টার্সে থিসিসের পরিমাণ অনেক কম থাকে। এটা করতে প্রচুর টাকা লাগে, আন্ডারগ্র্যাডের মতোই। অবশ্য পাস করে ভালো চাকরির নিশ্চয়তা আছে। তবে এখানে স্কলারশিপ পাওয়া যায় না। যদি বা যায়, তাহলেও বড়জোর ৫০% ওয়েভার পাওয়া যেতে পারে, এর বেশি না। কাজেই, রইলো বাকি PGR বা RHD। এই ক্ষেত্রেই আমাদের বুয়েট বা অন্য ভার্সিটির ছেলেরা বেশি অ্যাপ্লাই করে। এক্ষেত্রে সাধারণত কোন কোর্সওয়ার্ক থাকে না, বা থাকলেও অনেক কম থাকে। পুরো মাস্টার্স/পিএইচডি জুড়েই থাকে শুধু থিসিস। আমি যে নিয়মাবলীর কথা এখানে বলবো, তা এই PGR বা RHD এর জন্যই প্রযোজ্য হবে। আর হ্যাঁ, ইউনিভার্সিটি বিশেষে নিয়ম কানুন কিছু এদিক সেদিক হতে পারে, কিন্তু মূল জিনিসটা সব জায়গায় প্রায় একই।
    ধাপ – ১: কী করতে চান তা আগে ঠিক করেন : আগে ঠিক করেন কী করতে চান। এটা যে একদম খুব স্পেসিফিক হতে হবে তা না। কিন্তু মোটামুটি একটা আইডিয়া থাকা দরকার। যেমন অনেকেই পিএইচডি করতে চায়, আবার অনেকে মাস্টার্স করে কয়েক বছর একটা ভালো চাকরি করতে চায়। যদি আপনি দ্বিতীয় লাইনের লোক হন, তাহলে বরং নর্থ আমেরিকাই আপনার জন্য ভালো জায়গা হবে। কারণ সেখানকার মাস্টার্সে কোর্সওয়ার্ক আর থিসিস দুটোই ভালো পরিমাণে থাকে। কাজেই সেখানে পাস করে চাকরি বা পিএইচডি দুই জায়গাতেই যাওয়া যায়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় যেহেতু পুরোটা বা বেশিরভাগই রিসার্চ, কাজেই মাস্টার্স করে পিএইচডি না করাটা আসলে ভালো সিদ্ধান্ত না (এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত মতামত)। কাজেই, যদি আপনি রিসার্চ লাইনে আসতে চান, তাহলেই কেবল অস্ট্রেলিয়ার PGR/RHD স্কিম আপনার জন্য প্রযোজ্য। এরপরে আসে আপনার টপিক। টপিকের উপর মোটামুটি একটা ধারণা থাকা উচিত। আপনার পিএইচডি থিসিসের টাইটেল কী হবে, সেটা ঠিক করা না থাকলেও চলবে (:-P), কিন্তু কোন বিষয়ের উপর পড়তে চান, তা ঠিক করেন, যেমন পাওয়ার অথবা টেলিকমিউনিকেশন (ইলেক্ট্রিক্যালের সাপেক্ষে উদাহরণ দিলাম) ইত্যাদি। আর হ্যাঁ, আপনি আন্ডারগ্র্যাডে কী পড়েছেন, তা নিয়ে মাথা ঘামাবার দরকার নাই। আন্ডারগ্র্যাডে পাওয়ার বা অন্য কিছু নিয়ে পড়াশোনা করে মানুষ পোস্টগ্র্যাড করে টেলিকমে, এমন বহু নজির আছে (আমি নিজেই তাদের একজন)। কাজেই, আপনি কোথায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, সেটা ঠিক করেন।
    ধাপ – ২: IELTS দেন : অস্ট্রেলিয়ায় এটা সবার আগে জরুরি। এখানে জিআরই লাগে না (আল্লাহ বাচাইছেন! :-P)। কিন্তু IELTS দিতে হবে। খুব আহামরি স্কোর দরকার নাই। সব ব্যান্ডে ৬.৫ করে রাখতে পারলেই বেশিরভাগ ইউনিভার্সিটিতে চান্স পাবেন। তবে হ্যাঁ, IELTS এর মেয়াদ থাকে মাত্র ২ বছর। কাজেই, যখন সিদ্ধান্ত নিবেন যে অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে আসবেন, তখনই IELTS দেন। বেশি আগে দিয়ে মেয়াদ উত্তীর্ণ করে ফেলার কোন কারণ দেখি না।
    ধাপ – ৩: নেট ঘাঁটাঘাঁটি করেন : ধরে নিলাম আপনি ধাপ ১ আর ২ কমপ্লিট করেছেন। এবার আপনার পালা নেটে বসার। প্রাচীন যুগের মানুষরা বলতো, অ্যারিস্টটলে যা নেই, তা নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। আর এখন আমরা বলি, গুগলে যা নাই, বস্তুজগতে তার অস্তিত্ত্বই নাই। কাজেই, জাগতিক সবকিছুই গুগলে পাবেন। অতএব, নেটে যান। সবচেয়ে ভালো বুদ্ধি সবগুলো ইউনিভার্সিটির অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে চষে বেড়ানো। কাজেই শুরু করে দেন।
    ধাপ – ৪: প্রফেসর ‘ধরা’ : রিসার্চ হাইয়ার ডিগ্রির জন্য শুরুতেই যা করতে হবে, তা হলো একজন সুপারভাইজর খুঁজে বের করা। ইউনিভার্সিটির অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ঘাঁটলে আপনি আপনার রিসার্চ ইন্টারেস্ট অনুযায়ী সুপারভাইজর খুঁজে পাবেন। এরকম কয়েকজন পোটেনশিয়াল সুপারভাইজরের লিস্ট করেন। এরপর তাদের ইমেইল করেন।
    ধাপ – ৫: প্রফেসরকে ইমেইল করা : প্রফেসরদের লিস্ট ও তাঁদের ইমেইল অ্যাড্রেস জোগাড় হয়ে গেলে তাদের ইমেইল করা শুরু করেন। সবচেয়ে ভালো হয় ইমেইলের একটা টেম্পলেট তৈরি করে নিলে। কোন জায়গা থেকে চোথা মারার দরকার নাই। সাজেশন পেতে পারেন বড় ভাই-আপুদের কাছ থেকে, বা গুগল ঘেঁটে। কিন্তু ধরে পুরাটা কপি করে দিয়ে মান-সম্মান ডুবায়েন না! সিম্পল, কিন্তু অবশ্যই নির্ভুল ভাষায় একটা জুতসই দেখে ইমেইল দাঁড় করান। ইমেইলে আপনার পড়াশোনা, চাকরির অভিজ্ঞতা, পাবলিকেশন (যদি থাকে), থিসিস, IELTS স্কোর, রিসার্চের প্রতি আপনার ইন্টারেস্ট ইত্যাদি ফোকাস করেন। নিজের ঢোল পিটাতে গিয়ে অ্যারোগেন্ট হবার দরকার নাই। আবার একদম মিনমিন করারও দরকার নাই। স্পষ্ট করে আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের যোগ্যতার কথা তুলে ধরেন। যদি আপনার কোন নেগেটিভ দিক থাকে, সেগুলো সুনিপুণভাবে এড়িয়ে যান।
    ধাপ – ৬: শুরু হলো অপেক্ষার পালা : এটাই আসলে আপনার নিজে থেকে করার সবশেষ ধাপ। কারণ এরপর আপনার নিজ থেকে আর কিছু করার নাই। প্রফেসরদের মেইল করে বসে থাকেন। ভুলেও আশা করবেন না যে তাঁরা আপনাকে রিপ্লাই দেবে। কারণ তাঁদের খেয়ে দেয়ে আরো অনেক কাজ আছে! শুধু তাঁরাই আপনার সাথে যোগাযোগ করবে, যারা আপনার ব্যাপারে, অর্থাৎ আপনাকে স্টুডেন্ট হিসাবে নেয়ার ব্যাপারে ইন্টারেস্টেড। কেউ যদি আপনার ব্যাপারে ইন্টারেস্টেড না হয়, তাহলে তাঁর এতো তেল নাই যে সেটা মেইল করে আপনাকে জানাবে। যদি কেউ পজিটিভ রিপ্লাই দেয়, তাহলে তাঁর সাথে আপনার রিসার্চ ইন্টারেস্ট নিয়ে আরো বিস্তারিত আলাপ করে (ইমেইলে বা স্কাইপে) রিসার্চ টপিক ঠিক করেন। পজিটিভ রিপ্লাই পাওয়ার র‍্যশিও (অর্থাৎ কয়টা মেইল করলে কয়টা রিপ্লাই পাওয়া যায়) বিভিন্ন রকম হতে পারে। আমি নিজে প্রায় ৩০ জনকে মেইল করে একজনের কাছ থেকে পজিটিভ রিপ্লাই পেয়েছিলাম, আর এখন তাঁর আন্ডারেই রিসার্চ করছি।
    ধাপ – ৭: প্রফেসরের কাছ থেকে গাইডলাইন নিয়ে ইউনিভার্সিটিতে অ্যাপ্লাই করা : প্রফেসর আপনাকে সুপারভাইজ করবে, কিন্তু অ্যাডমিশন বা স্কলারশিপ দেবে ইউনিভার্সিটি। প্রফেসরের কাজ হচ্ছে শুধু আপনার ব্যাপারে সুপারিশ করা। কাজেই, আপনাকে অবশ্যই ইউনিভার্সিটির অ্যাডমিশন ও স্কলারশিপের জন্য অ্যাপ্লাই করতে হবে। সাধারণত অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটিগুলোর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপ্লিকেশনের লাস্ট ডেট হয় অগাস্টের শেষের দিকে। অর্থাৎ আপনি যে বছরে রিসার্চ শুরু করতে চান, তার আগের বছর অগাস্টের মধ্যে আপনাকে অ্যাপ্লাই করতে হবে। কাজেই প্রফেসরের সাথে যোগাযোগ শুরু করবেন তারও কমপক্ষে ৩ মাস আগে থেকে। অ্যাপ্লাই করার জন্য কী কী লাগবে, তা আপনার সুপারভাইজর আপনাকে বলে দিবেন। সাধারণত রিসার্চের অ্যাপ্লিকেশনের সাথে একটা রিসার্চ প্রপোজাল দিতে হয়। ভয়ের কিছু নাই। আপনি কী করতে চান, তার উপর ২/৩ পেইজ লিখে দিলেই হবে। কীভাবে লিখতে হবে, আপনার প্রফেসর আপনাকে বলবেন। তবে সাধারণত আপনি কী বিষয়ে কাজ করবেন তার একটা আউটলাইন, আর ঐ বিষয়ে অন্যান্য জায়গায় কীরকম কাজ হচ্ছে, এসবই হয় রিসার্চ প্রপোজালের বিষয়। অস্ট্রেলিয়ায় অনেক ভার্সিটিতে অ্যাপ্লিকেশন ফি নাই। যেসবের ক্ষেত্রে আছে, সেসবের জন্য ফি দিবেন। ফি অস্ট্রেলিয়ায় থাকে এমন পরিচিত কাউকে দিয়ে দেয়াতে পারেন, তবে সবচেয়ে ভালো হয় নিজের একটা ইন্টারন্যাশনাল কার্ড করে নিলে। দেশের সব ব্যাঙ্কেই এখন এটা করা যায় বলে জানি। আমি নিজে করি নাই, তবে শুনেছি Standard Chartered ব্যাঙ্কের I-Card নাকি সবচেয়ে ভালো। এতে সুবিধা হচ্ছে, আপনার নিজের টাকা পয়সার হিসাব নিজের কাছেই থাকে, আর খুব কাছের মানুষ না হলে বিভিন্ন জায়গায় অ্যাপ্লিকেশনের জন্য মানুষজনকে বেশি পেইন না দেয়াই ভালো!
    শেষ ধাপ: Get visa and fly to Australia : ইউনিভার্সিটি যদি আপনার অ্যাপ্লিকেশন গ্রহণ করে (সাধারণত সুপারভাইজরের রিকমেন্ডেশন/সুপারিশ থাকলে তারা অ্যাপ্লিকেশন গ্রহণ করে), তাহলে তাদের কাছ থেকে অ্যাডমিশনের অফার লেটার, স্কলারশিপের অফার লেটার, CoE (Confirmation of Enrolment, এটা ভিসা পাওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট) ইত্যাদি সময়মতো পেয়ে যাবেন। সেটা নিয়ে ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই করে চলে যান সোজা অস্ট্রেলিয়া! ফরমালিটি //আবেদন প্রক্রিয়া : সরাসরি দূতাবাসের মাধ্যমে আবেদন করা যায়। আবার, অনলাইনে আবেদন করা যায় ও বিভিন্ন কনসালট্যান্সি ফার্ম এর মাধ্যমে আবেদন করা যায়।
    আবেদনের নিয়মাবলী :
    শিক্ষাগত যোগ্যতা : ক) শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে Student দের Undergraduate থেকে Doc. Degree Certificate থাকলে সে উচ্চ শিক্ষা জন্য অস্ট্রেলিয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে IELTS অবশ্যই লাগবে। Undergraduate এর ক্ষেত্রে ন্যূনতম IELTS স্কোর ৫.৫ এর ক্ষেত্রেএবং Post graduate এর ক্ষেত্রে ন্যূনতম ILTS স্কোর 6.0 প্রয়োজন।
    খ) অস্ট্রেলিয়াতে IELTS ছাড়া Students এর উচ্চ শিক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা নেই। সেক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া গিয়ে IETS দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
    গ) School শিক্ষার্থীদের জন্য O/A Level Certificate থাকলে IELTS দরকার হয় না।
    স্পন্সর : ক) বিষয়ভেদে বিভিন্ন পরিমাণ টাকা Sponsor দেখাতে হয়। Under graduate এর ক্ষেত্রে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা Sponsor দেখাতে হয় এবং Degree Program এর জন্য প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ টাকা ৬ মাস এর জন্য Sponsor দেখাতে হয়।
    খ) Sponsor Money এর সম্পদ মূল্য দেখানো যাবেনা, শুধুমাত্র নগদ টাকা দেখাতে হবে। তবে ডলার এর মূল্য তারতম্য হলে এর জন্য Sponsor Money হিসেব করে মোট টাকা দেখাতে হয়।
    গ) কোন ছাত্রের স্পন্সর দেখানোর জন্য blood Relation হলে ভাল। তবে Post-graduation এর ক্ষেত্রে first blood Relation হতে হবে। এর জন্য Bank Statement লাগে ও জাতীয় পরিচয়পত্র এবং জন্ম সনদ ইত্যাদির কাগজ জমা দিতে হয়।
    স্পাউস : শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে স্পাউসসহ আবেদন করা যায়। সেক্ষেত্রে তার স্ত্রীকে মাস্টার ডিগ্রী প্রাপ্ত হতে হবে, তার জন্য সে ৫ পয়েন্ট পাবে। স্কলারশিপ : সাধারণত উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে Scholarship (full) পাওয়ার জন্য তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Graduation complete করে আবেদন করতে হবে। সাধারণত স্কলারশিপ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ৫% শিক্ষার্থী যেতে পারে।
    অস্ট্রেলিয়ায় পার্ট টাইম জব : পড়া-লেখার পাশাপাশি সপ্তাহে ২০ ঘন্টা rপার্ট টাইম চাকরির সুযোগ রয়েছে। পার্ট টাইম জব করে একজন ছাত্র তার খরচ চালাতে পারে। Engineering, MBA, ACCA এবং Health study ইত্যাদি কোর্সগুলো ভাল চাকুরী পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়।
    অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী বসবাস সুবিধা : অন্য রাষ্ট্রের তুলনায় এখানে সহজে PR (Permanent Residence) এর সুযোগ থাকে। Students Graduation Complete করার পর সে PR এর জন্য আবেদন করতে পারে। সেক্ষেত্রে Result যদি ভাল থাকে তাহলে সরকার তাকে PR করে নিতে পারে। সাধারণত ACCA, LLB, MBA, Advanced diploma, Health student এবং Engineering ডিগ্রি অর্জনকারীদের PR পেতে সুবিধা হয়।
    অস্ট্রেলিয়া দূতাবাস : এটি গুলশান ১, ৮নং রোড এর সামনে অবস্থিত। ঠিকানা- জেড এন টাওয়ার (১ম তলা), রোড# ৪, প্লট# ২, ব্লক# এস ডব্লিউ ১, গুলশান এভিনিউ, ঢাকা-১২১২। ফোন ৯৮৯৫৮৯৪।