• কর্মজীবনে নেতৃত্ব : যেভাবে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন একজন অসামান্য নেতা

    ধরুন, অফিসে আপনার বস এতটাই নিখুতভাবে সবকিছু সামলে চলেছেন যেকোন ব্যাপারেই কর্মীদের অভিযোগ করার কোন অবকাশ নেই। কখনো ভেবে দেখেছেন তাঁর এই সুনিপুণতার রহস্য কি?
    কোন কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্বের দ্বায়িত্বে যারা থাকেন, তারাও কাজ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের মত হোঁচট খান। তাই বলে তারা কখনই থেমে থাকেন না। যাবতীয় দুর্বলতা মোকাবেলা করতে করতেই একটা সময় তারা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে সুদক্ষ হয়ে ওঠেন।
    “টাফ ট্রুথস” বইয়ের লেখিকা ডেইড্রি ম্যালোনী এ ব্যাপারে বলেন, “ভালো নেতৃত্বের পূর্বশর্ত হচ্ছে নিজের প্রতিটি পদক্ষেপের প্রভাব সম্পর্কে অবগত থাকা”। বইটিতে তিনি সুদৃঢ় নেতৃত্ব নিয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেখান থেকেই কিছু অংশ আজকে প্রিয়.কম পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

    মনে রাখবেন, সবকিছুর সাথেই জড়িয়ে আছে রাজনীতি
    রাজনীতি বলতে এই লেখায় কেবলমাত্র আমাদের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের লড়াই বোঝানো হচ্ছে না। এখানে বিশেষভাবে ইঙ্গিত করা হচ্ছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের রাজনীতির দিকে। প্রতিদিন আমরা এমন অনেক মানুষের সাক্ষাত পাই যাদের দিয়ে আমাদের কিছু স্বার্থ হাসিল হতে পারে। কোন কোন ক্ষেত্রে আমরা তাদেরকে ব্যবহার করে নিজের আখেরও গুছিয়ে নিই। আপাতদৃষ্টিতে কাজটি খারাপ মনে হলেও প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য একজন নেতাকে এধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হতেই পারে। সফলভাবে নেতৃত্ব দিতে হলে যেমন প্রতিষ্ঠানের নৈতিকতা ঠিক রাখতে হবে, তেমনি অবস্থা বুঝে মানুষকে প্ররোচিত করার ক্ষমতাও রাখতে হবে আপনাকে।

    সাফল্য লাভ করায় ধীরে ধীরে আপনার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়বে,সুতরাং মানসিকভাবে তৈরি থাকুন
    যখন আপনি নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করার প্রক্রিয়ার মাঝে থাকবেন, তখন অনেকেই আপনার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু, যখনই আপনি অন্যদের সাফল্যকে ছাড়িয়ে নিজের একটি দৃঢ় অবস্থান গড়ে নিতে থাকবেন তখনই সবাই আপনাকে ঈর্ষার চোখে দেখবে। এটা একটা অলিখিত নিয়ম। তাই নেতৃত্বে সফলতা পেলে আপনাকে কখনও কখনও একদম একা কাজ করতে হবে, এ ব্যাপারটা অবশ্যই মাথায় রাখবেন।

    নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা লাভ করুন
    আমরা বেশিরভাগ মানুষই সমাজে বা কর্মস্থলে নিজের অবস্থান নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট থাকি। কিন্তু অন্য সবাই আমার অবস্থানকে কি চোখে দেখছে সেটা নিয়েও একটা স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। তাই, একজন ভালো নেতা হিসেবে আপনার কাজ হবে প্রতিষ্ঠান এবং আপনার নিজের সম্পর্কে মানুষ কি ভাবছে তা আমলে নেয়া। যখন আপনি আত্নকেন্দ্রিক না হয়ে জনসাধারণের কাছে আপনার কাজ নিয়ে মতামত জানতে চাইবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের সাথে আপনার একটি বন্ধন সৃষ্টি হবে। আর এভাবেই আপনি অনেক মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে পারবেন, যা কিনা আপনাকে একজন সফল নেতা হিসেবে অনেকদূর নিয়ে যাবে।

    প্রত্যেক মানুষেরই কিছু দুর্বলতা থাকে, সুতরাং দুর্বলতাকে আঁকরে ধরতে শিখুন
    বাইরে থেকে আমরা য্তই আত্নবিশ্বাসী হই না কেন, ব্যর্থতার ভয় আমাদেরকে সবসময়ই ঘিরে রাখে। একজন সফল নেতা সবসময় এই ব্যাপারটি মাথায় রেখে কাজ করেন। ভয়ের তাড়নাতেই তারা অনেকসময় অসাধারণ সব কাজ করে বসেন, যা কিনা সমাজে তাদের আলাদা পরিচয় সৃষ্টি করে। কোন কাজে একেবারেই চেষ্টা না করে ব্যর্থ হওয়ার চাইতে নিজের সর্বোচ্চ মেধা দিয়ে বিপত্তি মোকাবেলা করাই একজন প্রকৃত নেতার লক্ষণ।

    আপনার প্রত্যেক পদক্ষেপ সবাই পর্যবেক্ষণ করছে, তাই সবসময় নিজেকে সামলে রাখুন
    আপনি যেধরনের সমস্যার মধ্যেই থাকুন না কেন, কখনই সেটা নিজের বেশ-ভূষা বা আচার-আচরণে প্রকাশ করবেন না। কারণ, প্রতিনিয়নতই আপনাকে কেউ না কেউ লক্ষ্য করছে। খারাপ সময়েও মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করুন। খুব অল্প সংখ্যক মানুষকে বেছে নিন এবং তাদের বিশ্বাস অর্জন করুন। আপনার এই বিশ্বস্ত দলটিই নানা দুঃসময় কাটিয়ে উঠতে আপনাকে সাহায্য করবে।

    বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের শক্তি সংরক্ষণ করুন
    ভালো নেতৃত্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট হলো নিজের ক্ষমতার সীমারেখা অতিক্রম না করা। সময়ের সাথে সাথে শক্তি বাঁচিয়ে রাখা এবং সুযোগ বুঝে কাজ করা – আপনার সাফল্য লাভের পথকে অনেক মসৃণ করে তুলতে পারে। তাই এমন কোন কাজের পিছনে সময় ব্যয় করবেন না যা কেবল আপনার মনে হতাশার জন্ম দিচ্ছে। বরং সেইসব প্রকল্প হাতে নিন যেগুলো আপনাকে প্রকৃতভাবেই আকৃষ্ট করে।

    নিজেই নিজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ না হয়ে অন্যকে আপনার তারিফ করার সুযোগ দিন
    নেতা হিসেবে সফল একজন ব্যক্তি কখনই নিজের ঢাক-ঢোল পেটান না। আপনি যদি প্রতিনিয়তই নিজের কাজ সম্পর্কে আত্নতুষ্টিতে ভোগেন কিংবা যাবতীয় সাফল্যের ক্রেডিট শুধু নিজেকেই দেন, তাহলে আপনার কর্মীদের মধ্যে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য। প্রতিষ্ঠানের সফলতার পেছনে আপনার ভূমিকা অবশ্যই থাকবে, তবে তা কখনই আগ বাড়িয়ে প্রকাশ করতে যাবেন না। বরং আপনার টিমের প্রত্যেকে এই সাফল্যের ভাগিদার করে নিন। এধরনের আত্নবিশ্বাস গড়ে তুলতে প্রথমত আপনাকে নিজের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। তাহলেই আপনি নিজের শক্তি সম্পর্কে ঠিকমত অবগত হবেন এবং প্রতিষ্ঠানের ভালোর জন্য সেগুলো ব্যবহার করতে আগ্রহী হবেন।

    কখনই অন্য কারো সমালোচনা করবেন না
    পরচচর্চার বিষয়টি আমরা অনেকেই এড়িয়ে চলতে পারিনা। কিন্তু মনে রাখবেন, একজন সফল নেতা হতে হলে আপনাকে যাবতীয় পরনিন্দা-পরচর্চা করার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। সবার কাজকে সমানভাবে মূল্যায়ন করতে শিখুন। একজন কর্মীর কাছে আরেকজন কর্মীর সমালোচনা করা যেমন আপনার ব্যক্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তেমনি প্রতিষ্ঠানের ঐক্যও নষ্ট করে।

    নিজের দায়িত্বসীমার বাইরেও কাজ করুন
    অফিসে নিত্যদিনের একঘেয়ে কাজগুলো করা আমাদের কাছে খুব সহজ মনে হয়। নিজ নিজ দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছি ভেবে আমাদের মনে একধরণের প্রশান্তিও আসে। কিন্তু এই ব্যাপারটি আপনাকে কখনই সবার থেকে আলাদা করে তুলবে না। সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে পৌঁছতে হলে অবশ্যই নতুন কিছু করুন। সনাতনী ধ্যান-ধারণার বাইরে নতুন নতুন কর্মপদ্ধতি উদ্ভাবন করুন। প্রতিটি নতুন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অসাধারণ কিছু গড়ে তোলার চেষ্টা করুন।

    যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায় নিজেকে সুদক্ষ করে তুলুন
    প্রথম দেখাতেই মানুষের উপর এমন প্রভাব বিস্তার করুন যেন আপনাকে তারা মনে রাখে। ভালো নেতৃত্বের জন্য অসাধারণ নেটওয়ার্কিং ক্ষমতা থাকা অপরিহার্য। প্রায় সব জায়গাতেই নিজের উপস্থিতি সরবভাবে জানান দিন। এভাবে আস্তে আস্তে অনেক চেনা-মুখ জুটে যাবে আপনার যাকিনা পরবর্তীতে আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রসারে ভূমিকা রাখবে।

    অফিসে বাইরেও ব্যক্তিগত/পারিবারিক জীবনের জন্যও সময় রাখুন
    কর্মজীবন এবং ব্যক্তিজীবনের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন ভালো নেতা সবসময়ই নিজের মেধা ও মননের বিকাশের দিকে লক্ষ্য রাখেন। প্রতিদিনের ব্যস্ততার ভীড়ে সামান্য একটু সময় অবসর কাটালে আপনার মেধা ও ব্যক্তিত্ব আরও প্রস্ফুটিত হবে।সবসময় কেবল কাজের মধ্যেই ডুবে থাকবেন না। কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখুন এবং বাকিটুকু সময় পরিবারকে দিন। নিজের যদি কোন শখ থাকে, সেটাও চর্চা করতে পারেন এই অবসরে।